নিজস্ব প্রতিবেদক :
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, পশ্চিমা গণমাধ্যমের গুজব এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য নিয়ে ঢাকায় এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকার ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে এই সভার আয়োজন করা হয়। এতে ইমাম, খতিব ও বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম অংশ নেন।
সভায় বক্তব্য দেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরান দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ রেজা মীর মোহাম্মাদী। তিনি ইরানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন এবং পশ্চিমা মিডিয়ার প্রচারিত তথ্যকে গুজব ও বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ইরানে কিছু ব্যবসায়ী মুদ্রা সংকট ও ডলার-ইউরোর সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবধান বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন। এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা এবং বিশ্বের যেকোনো দেশেই এমন হতে পারে। তবে শুরুতে শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন পরবর্তীতে সহিংস রূপ নেয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে উসকে দেয়।
মীর মোহাম্মাদী অভিযোগ করেন, আমেরিকা ও ইসরাইলের নির্দেশনায় প্রশিক্ষিত ভারী অস্ত্রধারী গোষ্ঠী আন্দোলনরত সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালায়। এতে বহু নিরপরাধ মানুষ নিহত হন। সহিংসতার সময় মসজিদে অগ্নিসংযোগ, বাস ও অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়া, দোকানপাট ভাঙচুরসহ ভয়াবহ নাশকতা চালানো হয়। নিহতদের মধ্যে মসজিদের নিরাপত্তাকর্মী, হাসপাতালের নার্স, পুলিশ সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন।
তিনি জানান, জানুয়ারি মাসে সংঘটিত এসব সন্ত্রাসী হামলায় মোট ৩ হাজার ১১৭ জন মানুষ নিহত হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২৭ জন ছিলেন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৬৯০ জন ছিল সন্ত্রাসী। তবে পশ্চিমা গণমাধ্যম এসব ঘটনাকে অতিরঞ্জিত ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে।
তিনি আরও বলেন, পশ্চিমা মিডিয়ার তৈরি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আমেরিকা ও ইসরাইল ইরানের ভেতরে অবস্থানরত সন্ত্রাসীদের নির্দেশনা দিচ্ছিল। এ কারণে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ইরান সরকার সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়, যদিও দেশের অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক ইন্টারনেট সচল ছিল। এ সময় ইরান দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে স্টারলিংক পরিষেবাও বন্ধ করা সম্ভব।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত আলেম, ইমাম ও খতিবদের উদ্দেশ্যে তিনি আহ্বান জানান, খুতবার মাধ্যমে ইরানের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য, যাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ইরান সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে পারে।
এক প্রশ্নের উত্তরে ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের কারণ ব্যাখ্যা করে মীর মোহাম্মাদী বলেন, ইরানের একটি সুস্পষ্ট মডেল রয়েছে, যার তিনটি মূল ভিত্তি হলো— রাহবারের নেতৃত্ব, ঐক্যবদ্ধ জনতা এবং দ্বীন ইসলাম।
তিনি বলেন, আমেরিকা ও ইসরাইলের কর্মকাণ্ড তাদের শক্তির পরিচয় নয়, বরং ভয় থেকেই তারা এসব করছে। ইরানকে দুর্বল করার লক্ষ্যে তারা সময়, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি করছে এবং মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ভুল ধারণা ছড়াচ্ছে। বর্তমান চ্যালেঞ্জটি মূলত একটি মিডিয়া সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরান-ইসরাইলের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইল পরাজিত হওয়ার পরই এসব তৎপরতা নতুন করে শুরু হয়েছে। ৮ জানুয়ারির সন্ত্রাসী হামলাকে ইরানিরা যুদ্ধের ১৩তম দিন হিসেবে বিবেচনা করছে।
শেষে তিনি বাংলাদেশের জনগণের কাছে দোয়া কামনা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন, সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।